‘এমন যদি না হত’

ন্যান্সি আমার খুব কাছের বন্ধু। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আমরা বিভিন্ন সংগঠনে জড়িয়ে পড়ি। বিবিএতে পড়াকালীন আমাদের বেশিরভাগ সময় কেটেছে চায়ের আড্ডায়।

মধুর ক্যান্টিন, কলাভবন, মল চত্বর আর শামসুনাহার হলের সামনের কথা না বললেই নয়। লেখাপড়ার চাপ, তবুও লাইব্রেরিতে নিজেকে ধরে রাখা-সেকি অস্থিরতা।

বন্ধুরা মিলে গ্রুপে যখন পড়াশোনা করতাম, মাঝে মাঝে তাদের কাছে আকুতি-মিনতি করতাম ৫ মিনিটের জন্য। সময়টা হয়তো কোনোদিন পেতাম কোনোদিন পেতাম না। আর পেলে ৫ মিনিটের জায়গায় ৫০ মিনিট ঘুরে আসতাম। ফিরে এসে দেখতাম বন্ধুদের অগ্নীমূর্তি চেহারা।

প্রিয় পাঠক, এ সংখ্যায় লিখছি ‘এমন যদি না হত’। স্বাভাবিকভাবেই মনে হচ্ছে কেন বারবার এই শব্দগুলো ব্যবহার করছি। না, আসলে আমি যা বলতে চাই তা কোনো গল্প বা কাহিনি নয়।

যা হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। আমি তখন বিবিএ দ্বিতীয় বর্ষে আর মেয়েটি মাস্টার্সে। স্কাউট থেকে কোনো অনুষ্ঠান হলে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করতাম আর ন্যান্সি অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের।

আমাদের পরিচয়টা হয়েছিল টিএসসির একটি ট্রেনিংয়ে। ন্যান্সি আমাকে নামে চিনতো, কিন্তু আমি চিনতাম না। যাই হোক, আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে সংগঠনের হয়ে কাজ করেছি। আমি থার্ড ইয়ারে আর মেয়েটি মাস্টার্স শেষ করে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজেছি। এরপর মাঝে মাঝে আমাদের দেখা হত। তাকে নিজেও সময় দিতে পারতাম না।

নাটক থেকে শুরু করে বিএনসিসির কাজ, আর লেখাপড়ার চাপতো রয়েছেই। ন্যান্সিও চাকরি খুঁজতে ব্যস্ত। দু’বছর পর আমি যখন এমবিএতে ’হঠাৎ একদিন ন্যান্সির সঙ্গে দেখা। ওহ্ সেকি আনন্দ। আমরা অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়েছি শিল্পকলার চত্বরে। সঙ্গে আরো বন্ধু-বান্ধব। মেয়েটি একটি বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি করে। অনেক সময় দিতে হয় চাকরিতে। আর বাসায় ফিরে অসুস্থ মায়ের সেবাযত্ন করতে হয়।

তার না-কি নিজের জন্য সময় হয় না। দু‘বছর পর ন্যান্সিকে যতবার দেখেছি ততবারই অবাক হয়েছি। আচরণ, সর্বোপরি ওঠতি চেহারায় এক অসীম নীরবতা। প্রশ্ন করিনি কখনও, যদি কিছু ভেবে বসে। এই নীরবতার পেছনে কি আছে তার।

বন্ধুত্বের অধিকার নিয়ে একদিন সাহস করেই বলে ফেললাম কি হয়েছে তোর। নিজেকে লোকানোর সেকি চেষ্টা। প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে সে বলতে থাকে জানিস হরতালে অফিসে যাওয়া যে কি বিড়ম্বনা। আমি তাকে বলি দেখ লুকোচুরি করিস না। আমাকে বল তোর কি হয়েছে।

‘না কিচ্ছু না’, জানার জন্য যখন খুব চাপাচাপি করছি এক পর্যায়ে ও কেঁদে ফেললো। সে কান্নায় যে কত কষ্ট, কত অনুভূতি, আর কতনা অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে। তা এই প্রথম অনুভব করলাম।

হেমন্তের শিশিরে ভেজা শেফালি ফুল দেখেছি। রাত শেষে তাদের ঝরেপড়া আর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকার সে কান্না হয়তো আমরা কখনো অনুভব করিনি।

নীড় থেকে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চা পাখিটির কান্না আর মায়ের ভালোবাসায় বাচ্চাটাকে ফিরে পাওয়ার আর্তিতে অনেক কিছুই স্বপ্ন থেকে গেছে আমার।

অনেকদিন পার হয়ে গেছে। এমবিএ শেষ করে একটি বিদেশি ব্যাংকে কাজ যোগদান করি।

আর ন্যান্সিরও একটি প্রমোশন হয়েছে। আমাদের সাথে দেখা হয় না কিন্তু ফোনে কথা হয়। মাঝে মাঝে ভাবতাম, কি এমন তার কষ্ট। কত কথাইনা, অজানা মনে ভেবেছি। কিন্তু সন্দেহ থেকেই যেত। আমাদের এ জীবনে অনেক কিছুই আড়ালে থেকে যায়। অথবা নিজেই ইচ্ছা করে ভুলে যাই।

অবশেষে একদিন ন্যান্সি মুখ খুললো। বললো ‘বয়সে আমার বাবার মতো। তিনি আমার বস। শ্রদ্ধার গভীর সমুদ্রে আমি তাকে রেখেছিলাম। বসও আমাকে মেয়ের মতো স্নেহ করত। একদিন অফিসের প্রজেক্টের কাজে বস আর আমার দুই সহকর্মীসহ আমাদেরকে ঢাকার বাইরে যেতে হয়।’

‘একটা সময় বস আমার সরলতার সুযোগ নেয়। ন্যান্সি একদমে কথাগুলো বলে ফেললো। আমিও নীরবে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। ন্যান্সি আর কিছুই বলতে পারেনি। অশ্রুসিক্ত নয়নে তার শেষ কথা ছিল। আমি কোনোদিন ভাবিনি এমনটি হবে।’

আমি থেমে যাই। ইচ্ছে হয় বিদ্রোহী কাজী নজরুলের মতো করে বলতে ‘ভেঙে করি সব চুরমার’ পারি না, বাস্তবতা আমাকে আঁকড়ে ধরে। এমনি নাম না জানা অনেক ন্যান্সি আমাদের সমাজে রয়েছে। যা আমরা দেখেও দেখি না।

অথচ এই আমরাই আশরাফুল মাখলুকাত। কেবল শুধু এই কথাটি মনে হয় এমন যদি না হত। কতইনা সুন্দর হত আমাদের এ জীবন-ভূবন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*